আইন বিষয়ে ক্যারিয়ার গড়ুন
আইন পড়ার সব পথ, আর পাস করার পর কোন কোন পেশায় যাওয়া যায়, এক পাতায়। এইচএসসির পর বা স্নাতকের পর, চাকরি করতে করতেও আইন পড়া যায়।
১এক নজরে পথ
আইন পড়ার দুটি প্রধান রাস্তা। দুটোই শেষে একই জায়গায় মেলে: বার কাউন্সিল, বিজেএস ও চাকরি।
পথ ক: এইচএসসির পর
পথ খ: স্নাতকের পর
২কোন পথে পড়বেন
নিজের বয়স, পড়াশোনা আর সময় দেখে পথ বেছে নিন।
এলএলবি অনার্স (৪ বছর)
- যোগ্যতা
- এইচএসসি পাস, যেকোনো বিভাগ। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব জিপিএ শর্ত থাকে।
- কোথায়
- পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ (ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে)। এছাড়া ইউজিসি অনুমোদিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়।
- সময়
- ৪ বছর, পূর্ণকালীন।
- সাবধানতা
- বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আগে দেখুন আইন প্রোগ্রামটি ইউজিসি অনুমোদিত এবং বার কাউন্সিল স্বীকৃত কি না। না হলে পরে সনদ পরীক্ষায় সমস্যা হতে পারে।
- পরের ধাপ
- এলএলএম, বার কাউন্সিল, বিজেএস বা চাকরি।
এলএলবি প্রফেশনাল (২ বছর), জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়
- যোগ্যতা
- যেকোনো বিষয়ে স্নাতক (পাস বা অনার্স) ন্যূনতম ফলাফলের শর্ত ভর্তি বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী।
- কোথায়
- জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ৭২টি ল কলেজ, প্রায় সব বিভাগে।
- কাঠামো
- ১ম বর্ষ (প্রথম পর্ব): ৭টি পত্র। ২য় বর্ষ (শেষ পর্ব): ৮টি পত্র। বছর শেষে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা; ২০২৬ সালের পরীক্ষা প্রতি শুক্রবার।
- ক্লাস
- অনেক কলেজে ক্লাস বিকেল বা সন্ধ্যায় হয়, তাই চাকরির পাশাপাশি পড়া যায়।
- পরের ধাপ
- বার কাউন্সিল, বিজেএস, বা ২ বছরের এলএলএম।
এলএলএম (মাস্টার্স)
- মেয়াদ
- এলএলবি অনার্সের পর ১ বছর। ২ বছরের এলএলবির পর ২ বছর।
- কোথায়
- পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়।
- কাজে লাগে
- বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা, গবেষণা, কর্পোরেট, মানবাধিকার বা আন্তর্জাতিক আইনে বিশেষজ্ঞ হওয়া। আইনজীবী বা বিচারক হতে এলএলএম বাধ্যতামূলক নয়।
অন্যান্য পথ
- পিএইচডি
- এলএলএমের পর, মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা ও গবেষণার জন্য।
- বার-অ্যাট-ল
- যুক্তরাজ্যে পড়ে ব্যারিস্টার হওয়ার পথ। খরচ বেশি। দেশে অনুশীলন করতে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সনদ লাগে।
- ডিপ্লোমা
- মানবাধিকার, শ্রম আইন, কর আইনের মতো স্বল্পমেয়াদি কোর্স। চাকরিতে বাড়তি যোগ্যতা হিসেবে কাজে লাগে।
৩পাস করার পর পেশা
এলএলবির পর সবচেয়ে বড় দুটি পথ আইনজীবী ও বিচারক। এর বাইরেও অনেক চাকরি আছে।
আইনজীবী (অ্যাডভোকেট)
- এলএলবি পাস।
- অন্তত ১০ বছরের অভিজ্ঞ একজন আইনজীবীর অধীনে শিক্ষানবিশি শুরু (বার কাউন্সিলে ইন্টিমেশন জমা)। এমসিকিউ পরীক্ষায় বসতে শিক্ষানবিশির ৬ মাস পূর্ণ হতে হয়।
- বার কাউন্সিলের তালিকাভুক্তি পরীক্ষা, তিন ধাপে: এমসিকিউ, লিখিত, মৌখিক। এমসিকিউতে পাস করলে লিখিত, লিখিততে পাস করলে মৌখিক। লিখিততে ফেল করলে পরের বার আবার এমসিকিউ দিতে হয় না।
- সনদ পেয়ে জেলা আদালতে অনুশীলন শুরু।
- পরে হাইকোর্ট বিভাগে অনুশীলনের অনুমতি (নিচে শর্তগুলো দেখুন)। এরপর অভিজ্ঞতা বাড়লে আপিল বিভাগ।
হাইকোর্ট বিভাগে অনুশীলনের অনুমতি: শর্ত ও পরীক্ষা
- বার কাউন্সিলের তালিকাভুক্তি: প্রথমে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের তালিকাভুক্ত অ্যাডভোকেট হতে হবে, আর দেশের যেকোনো স্থানীয় আইনজীবী সমিতির (বার অ্যাসোসিয়েশন) সদস্য হতে হবে।
- নিম্ন আদালতে অনুশীলনের অভিজ্ঞতা: অধস্তন আদালতে (জজ কোর্ট) অ্যাডভোকেট হিসেবে সাধারণত অন্তত ২ বছর অনুশীলন। তবে ৪ বছরের এলএলবি (অনার্স)-এর পর উচ্চতর দ্বিতীয় শ্রেণিতে এলএলএম থাকলে এই ২ বছরের শর্ত থেকে অব্যাহতি পাওয়া যেতে পারে। সেক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবীর অধীনে ১ বছর নিরবচ্ছিন্ন শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজ করতে হয়।
- শিক্ষানবিশকাল (পিউপিলেজ): সুপ্রিম কোর্টের একজন যোগ্য আইনজীবীর অধীনে শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজ (যোগ্যতা অনুযায়ী ৬ মাস বা ১ বছর), আর এই চুক্তিনামা বার কাউন্সিলে জমা।
- মামলার তালিকা: নিজে পরিচালনা করা বা সিনিয়র আইনজীবীকে সহায়তা করা ২৫টি মামলার তালিকা জমা দিতে হয়, সাধারণত ৫টি দেওয়ানি, ১০টি রিট আর ১০টি ফৌজদারি।
- হাইকোর্ট পারমিশন পরীক্ষা: সব শর্ত পূরণের পর বার কাউন্সিলের পরীক্ষা, এখন (২০২৬) তিন ধাপে: এমসিকিউ (১০০ নম্বর, পাস ৫০), লিখিত আর মৌখিক।
বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের বিশেষ নিয়ম: অন্তত ১০ বছর বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা বা বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করলে কোনো পরীক্ষা ছাড়াই সরাসরি হাইকোর্ট বিভাগে অনুশীলনের আবেদন করা যায়। তবে অনুমতি পেলে আর নিম্ন আদালতে অনুশীলন করা যায় না।
- পরীক্ষার বিষয়
- ৭টি: দেওয়ানি কার্যবিধি, ফৌজদারি কার্যবিধি, দণ্ডবিধি, সাক্ষ্য আইন, সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, তামাদি আইন, বার কাউন্সিল আদেশ ও আচরণবিধি।
বিচারক (বিজেএস, সহকারী জজ)
- যোগ্যতা
- এলএলবি বা এলএলএম। শিক্ষাজীবনের কোনো স্তরে তৃতীয় বিভাগ বা শ্রেণি গ্রহণযোগ্য নয়। বয়স সর্বোচ্চ ৩২ বছর।
- প্রিলিমিনারি
- ১০০ নম্বরের এমসিকিউ, প্রতি ভুলে ০.২৫ কাটা, পাস নম্বর ৫০।
- লিখিত
- ১০০০ নম্বর, গড়ে ৫০% লাগে; কোনো বিষয়ে ৩০-এর কম পেলে অকৃতকার্য।
- মৌখিক
- ১০০ নম্বর।
- পদোন্নতি
- সহকারী জজ, সিনিয়র সহকারী জজ, যুগ্ম জেলা জজ, অতিরিক্ত জেলা জজ, জেলা জজ। অভিজ্ঞতা ১০ বছরের বেশি হলে হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি হওয়ার যোগ্যতা (সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদ)।
সরকারি চাকরি
- বিসিএস
- যেকোনো স্নাতক পারেন। আইনের ছাত্রদের সংবিধান ও আইন অংশে বাড়তি সুবিধা থাকে।
- সরকারি আইন কর্মকর্তা
- পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি), গভর্নমেন্ট প্লিডার (জিপি) ইত্যাদি। অভিজ্ঞ আইনজীবীদের মধ্য থেকে সরকার নিয়োগ দেয়।
- প্রতিষ্ঠানের আইন কর্মকর্তা
- সরকারি ব্যাংক, বীমা, দুর্নীতি দমন কমিশন, সিটি করপোরেশনসহ অনেক প্রতিষ্ঠানে লিগ্যাল অফিসার পদ।
- সশস্ত্র বাহিনী
- সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর আইন শাখায় কর্মকর্তা পদ।
কর্পোরেট ও অন্যান্য
- ল ফার্ম ও কর্পোরেট
- কোম্পানির আইন উপদেষ্টা, চুক্তি, কর, শ্রম ও মেধাস্বত্ব আইনের কাজ। ইংরেজিতে দক্ষতা বড় সুবিধা।
- এনজিও ও মানবাধিকার
- আইনি সহায়তা, নারী ও শিশু অধিকার, মানবাধিকার সংস্থা।
- শিক্ষকতা
- ল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে। সাধারণত এলএলএম লাগে।
- সাংবাদিকতা
- আদালত প্রতিবেদক বা আইনবিষয়ক লেখক।
৪সাধারণ প্রশ্ন
২ বছরের এলএলবি (প্রফেশনাল) করে কি আইনজীবী হওয়া যায়?
হ্যাঁ। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের এলএলবি পাস করে শিক্ষানবিশি শেষে বার কাউন্সিলের পরীক্ষায় বসা যায়।
২ বছরের এলএলবি দিয়ে কি বিজেএস পরীক্ষা দেওয়া যায়?
হ্যাঁ, এলএলবি ডিগ্রি থাকলেই আবেদন করা যায়। তবে বয়স ও ফলাফলের শর্ত প্রতিটি বিজ্ঞপ্তিতে মিলিয়ে নিন।
চাকরি করতে করতে কি এলএলবি পড়া যায়?
হ্যাঁ, অনেকেই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ল কলেজে চাকরির পাশাপাশি পড়েন। তবে চাকরিতে থাকা অবস্থায় আইনজীবী হিসেবে অনুশীলন করা যায় না; সরকারি চাকরিতে থাকলে পড়ার আগে নিজের দপ্তরের নিয়মও দেখে নিন।
বেশি বয়সে কি আইন পড়া বা আইনজীবী হওয়া যায়?
এলএলবি ভর্তি ও বার কাউন্সিলের পরীক্ষায় বয়সের ঊর্ধ্বসীমা নেই। অবসরের পরও অনেকে আইন পেশায় আসেন। বয়সসীমা আছে বিজেএস ও সরকারি চাকরিতে।
অনার্স না প্রফেশনাল, কোনটা ভালো?
এইচএসসির পর থাকলে এবং পূর্ণ সময় দিতে পারলে ৪ বছরের অনার্স। অন্য বিষয়ে স্নাতক হয়ে গেলে বা চাকরি করলে ২ বছরের প্রফেশনাল। আইনজীবী বা বিচারক হওয়ার পরীক্ষায় দুটোই চলে।
বার কাউন্সিলের প্রস্তুতি কখন শুরু করব?
এলএলবি পড়ার সময় থেকেই। বার কাউন্সিলের ৭টি আইনের বেশির ভাগ এলএলবির সিলেবাসেই আছে। প্রতিদিন অল্প অল্প এমসিকিউ অনুশীলন করলে পাসের পরপরই পরীক্ষায় বসা সহজ হয়।
সর্বশেষ যাচাই: অক্টোবর ২০২৬। নিয়ম ও যোগ্যতা সময়ে সময়ে বদলায়; আবেদনের আগে বার কাউন্সিল, বিজেএসসি ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দেখে নিন।